মেনু
সংবাদ টাইমস
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা
কনভার্টার

ধর্মপাশায় সিলিন্ডার কেলেঙ্কারি ঢাকতে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬ 209 বার পঠিত
ধর্মপাশায় সিলিন্ডার কেলেঙ্কারি ঢাকতে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’
ছবি : ডা. সুবীর সরকার

হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসাসেবায় শেষ ভরসাস্থল সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মুমূর্ষু রোগীর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন যেখানে অক্সিজেন, সেখানে চলছে নথিপত্রের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। জীবন বাঁচানোর সেই অতিজরুরি সিলিন্ডারের বাস্তব সংকটের চিত্র তুলে ধরাটাই যেন ‘কাল’ হয়ে দাঁড়াল এক সংবাদকর্মীর জীবনে। ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার সত্য প্রকাশ করায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নয়; বরং এক মফস্বল সাংবাদিককে রুদ্ধদ্বার কক্ষে অবরুদ্ধ করে জেরা, ভয়ভীতি আর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ‘পরিণতি ভালো হবে না’ বলে শাসানোর এক নজিরবিহীন নাটক মঞ্চস্থ হলো খোদ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে।


ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি সিলেটের স্থানীয় দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকায় ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট ও হিসাবে বড় ধরনের গরমিল নিয়ে একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশের পর। খবরটি জনসমক্ষে আসতেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদলিপি না পাঠিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সংবাদটিকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে একটি পোস্ট দেয়।


এরপর শুরু হয় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিককে বাগে আনার কৌশল। অভিযোগ উঠেছে, গত রোববার স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে একটি সমঝোতার কথা বলে মিষ্টি কথায় ডেকে নেওয়া হয় সবুজ সিলেট-এর ধর্মপাশা প্রতিনিধি এমারুল হককে। হাসপাতালে পৌঁছামাত্রই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সুবীর সরকারের খাস কামরায়।


কক্ষে প্রবেশ করতেই এমারুল হকের চোখ চড়কগাছ। সেখানে আগে থেকেই তৈরি ছিল এক ‘সালিশি আদালত’। উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং টিএইচও ডা. সুবীর সরকার, ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিক আহমেদ, স্থানীয় বিএনপি নেতা হাদিস ও ইকবালসহ হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের একটি দল। সব মিলিয়ে ২৫-৩০ জনের জমায়েত। এছাড়া পরিস্থিতি আরও থমথমে করে তোলে টিএইচওর নিজ এলাকা পার্শ্ববর্তী নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থেকে আসা কিছু বহিরাগত যুবকের উপস্থিতি, যারা পুরো সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষের বাইরে মহড়া দিচ্ছিল।

 

সেদিনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক এমারুল হক বলেন,
টিএইচও ডা. সুবীর সরকার নিজের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অনিয়ম ও চরম দায়িত্বহীনতা ঢাকতেই রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও বহিরাগত ক্যাডারদের জড়ো করে এই হেনস্তার ছক কষেছিলেন। আমাকে ঘরে আটকে রেখে একের পর এক আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করা হয়। টিএইচও সুবীর সরকার এবং সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিক আহমেদ সরাসরি আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন—হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে আর খবর করলে পরিণতি খুব খারাপ হবে। বাইরে তাঁর নিজের এলাকা মোহনগঞ্জের অচেনা কিছু বহিরাগত ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো পরিবেশটি এমন ছিল যেন আমি কোনো যুদ্ধাপরাধী, আর তারা আমার বিচার বসিয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ট্রমার মধ্যে পড়েছি। আমি টিএইচওর এই ক্ষমতার অপব্যবহার ও গুণ্ডামির দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

 

সাংবাদিককে অবরুদ্ধ করে বীরত্ব দেখালেও দালিলিক তথ্যের সামনে টিএইচওর সেই দম্ভ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফেসবুকে দেওয়া প্রতিবাদের পর দৈনিক সবুজ সিলেট-এর সিলেট অফিস থেকে টিএইচও ডা. সুবীর সরকারের সঙ্গে ফোনে কথা বলা হলে বেরিয়ে আসে আসল থলের বেড়াল।


ফোনালাপে ডা. সুবীর সরকার শুরুতে দাবি করেছিলেন, হাসপাতালে ৩৪টি সিলিন্ডারই পুরোপুরি চালু এবং সংবাদটি ‘মিথ্যা’। কিন্তু ব্যুরো প্রতিনিধির ধারালো জেরার মুখে একপর্যায়ে তিনি নিজেই স্বীকার করেন—কাগজে থাকা ৩৪টি সিলিন্ডারের মধ্যে ২টি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। অবশিষ্ট ৩২টির মধ্যে ২২টি খালি সিলিন্ডার রিফিলের জন্য পাঠানো হয়েছে বহু দূরে ময়মনসিংহে। অর্থাৎ হাসপাতালে জরুরি রোগীদের জন্য বাস্তবে মজুত ছিল মাত্র ১০ থেকে ১২টি সিলিন্ডার!


কাগজের ৩৪টি সিলিন্ডারের ২২টিই যেখানে নেই, সেখানে সংবাদ কীভাবে মিথ্যা হয়—এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি টিএইচও। এছাড়া তথ্য অধিকার আইনে সিলিন্ডারের সঠিক তালিকা চেয়ে সাংবাদিকের দেওয়া আবেদনেরও কোনো জবাব দেননি তিনি।


এ বিষয়ে ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তবে সাংবাদিককে কেন ডেকে আনা হয়েছিল, তা আমার জানা ছিল না। আমার উপস্থিতিতে কোনো অবরুদ্ধ বা হুমকির ঘটনা ঘটেনি।


ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় জানান, সংবাদ প্রকাশের পর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমার মা অসুস্থ থাকায় ছুটিতে থাকায় বিষয়টি প্রাথমিকভাবে দেখতে ওসি ও সমাজসেবা কর্মকর্তাকে বলা হয়েছিল। সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে বৈঠকের বিষয়টি আমি জানি না। কর্মস্থলে ফিরেই জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

 

চিকিৎসা প্রশাসনের এমন অপেশাদার আচরণ ও সাংবাদিককে রুদ্ধদ্বার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ বৃহত্তর সিলেট প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ। তারা এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে তা জনস্বার্থে তুলে ধরা সাংবাদিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবাদে কোনো অসংগতি থাকলে কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদ পাঠাতে পারে, প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারে। কিন্তু টিএইচও ডা. সুবীর সরকার যে কাজটি করেছেন, তা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার নোংরা প্রয়াস। একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে পুলিশ, রাজনীতিক আর নিজ এলাকার বহিরাগতদের ভাড়া করে এনে সাংবাদিকের ওপর ত্রাস সৃষ্টি করেন? এটি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। আমরা অবিলম্বে অভিযুক্ত টিএইচও ডা. সুবীর সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি। অন্যথায় বৃহত্তর সাংবাদিক সমাজ রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।


হাওরের এক প্রত্যন্ত হাসপাতালের অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে এই গরমিল কেবল কোনো দাপ্তরিক ফাঁকি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। আর সেই সত্য তুলে ধরতে গিয়ে আজ নিরাপত্তাহীনতায় স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। সচেতন মহলের প্রশ্ন—তদন্ত কমিটি কি পারবে টিএইচওর এই প্রভাবের প্রাচীর ভেঙে সত্যকে আলোর মুখ দেখাতে?

সারাদেশ থেকে আরও দেখুন

নিচে স্ক্রল করলে পরবর্তী সংবাদ আসবে